
জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা ছাত্র হত্যা মামলার আসামিদের আশ্রয়স্থল
- আপলোড সময় : ১৫-১২-২০২৪ ০১:০১:৪৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-১২-২০২৪ ০১:০১:৪৭ অপরাহ্ন


রাজধানীর চকবাজার থানার বকশীবাজারস্থ “জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা’ ভবনে হত্যা, চুরি, ডাকাতি মামলার পলাতক আসামিসহ অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের এমপি পুরান ঢাকার ত্রাস হাজী সেলিমের ছত্রছায়া সেখানে নানা অপরাধের পরিকল্পনা ও অবৈধ অস্ত্র গোলা বারুদের নিরাপদ গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই, এখনো সেখানে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা আন্দোলনে গুলি করে হত্যা চেষ্টার মামলা ছাড়াও মিরপুর মেট্রোরেলে হামলার পরিকল্পনাকারীরা অবস্থান করছে। এসব অপধারীদের নিরাপদে অবস্থান ও নিয়মিত পিকনিক পার্টির মত খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। অভিযোগে জানা গেছে, ‘জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা’ কার্যালয়ে বুক বাইডিং মেশিন, সাদা ছবি তৈরীর মেশিন, ব্রেন থার্মো ফরম মেশিন, লাইব্রেরীতে প্রায় দশ টন বেল বই ছিল। আবার পবিত্র বেল কোরান শরীফ, অত্যাধুনিক টেলিফোন অপারেটিং মেশিন ও ৪০ টি উন্নতমানের কম্পিউটার ছিল, প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল ছিল। যা জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বিক্রি করে অর্থ আত্মসাত করেছেন।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে, গত সোমবার বকশীবাজারস্থ জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে সংস্থাটি মহাসচিব আইয়ূব আলী হাওলাদারকে ঘিরে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বসে আড্ডা দিচ্ছেন। আর ভবনের নিচতলায় অন্ধ ব্যক্তিরা নাস্তা খাচ্ছেন। সামনের উঠানে রান্না করা হচ্ছিল। এসময় কথা হয়, আইয়ূব আলী হাওলাদারের সঙ্গে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানায় পৃথক দু’টি হত্যা চেষ্টার মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আশুলিয়া থানার বাইপাইল মোড় এলাকায় মোছা. জুলি বাদি হয়ে জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিব আইয়ূব আলী হাওলাদারসহ মোট ১৪৩ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। মামলা নম্বর ২০৩। আশুলিয়া বাইপাইল এলাকায় বাদির ছেলে বাসায় যাচ্ছিলেন। এসময় উক্ত জায়গায় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের মিছিল চলছি। সেখানে যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আন্দোলনকারীদের উপরে গুলি ছোড়ে আর বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এসময় বাদির ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধারের পর লোকজন প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর জামগড়া নারী ও শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে দীর্ঘ দিন চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তাকে বাড়িতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। এঘটনায় জুলি বেগম আদালতের মাধ্যমে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
এছাড়া অপর ঘটনাটি হচ্ছে, আশুলিয়া থানার বাইপাল বাস স্ট্যান্ড ওভার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে গত ২৫ অক্টোবর। এ ঘটনায় মো. জুয়েল বাদি হয়ে মামলা করেছে। উক্ত মামলা জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিব আইয়ূব আলী হাওলাদা, যুবলীগ নেতা, পিতা মৃত সিরাজ উদ্দিন হাওলাদারকে ৩৫ নম্বর আসামি সরা হয়েছে। তার সহযোগি আব্দুর রহিম, যুবলীগ নেতা। গত ৫ আগস্ট দুপুরে মামলার বাদি বাসা থেকে বের হয়ে বৈষম্য বিরোধী কোটা আন্দোলনের পক্ষে মিছিল করা হয়। তারা আশুলিয়ার বাইপাইল ব্রিজের দক্ষিণ পাশে মিছিল করতে ছিল। এসময় ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা কর্মীসহ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের ৩ থেকে ৪শ’ সন্ত্রাসী মিছিলে হামলা চালায়। সন্ত্রাসী রামদা, হকিষ্ট্রিক, লোহার পাইপ, রড, লাঠিসোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র দিলে হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মামলার বাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। এরপর সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পরও পঙ্গুত্ব বরণ করছেন তিনি। জানা গেছে, মামলার আসামিদের মধ্যে কেউ জন্মেছেন অন্ধ হয়ে আবার ডাকাতিসহ অপরাধ করতে গিয়ে জনরোসের শিকার হয়েও অন্ধ হয়েছে। এমন অন্ধজনদের সার্বিক কল্যাণে গড়ে তোলা হয় জাতীয় অন্ধ সংস্থা। বর্তমানে সংস্থাটির নাম বদলে রাখা হয়েছে জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা। সংস্থাটি ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ নীতিতে চলার লক্ষ্য থাকলেও সংস্থা সংশ্লিষ্টরা ‘অন্ধদের কল্যাণে নামে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনের নামে কম্পিউটারসহ আধুনিক কারিগরি শিক্ষা লাভ। মূলত এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ১৯৬৪ সালে গড়ে উঠেছিল জাতীয় অন্ধ সংস্থা। তবে গত ১১ বছরে নজিরবিহীন সব দুর্নীতিতে জড়িয়ে সংস্থাটি নিজেই এখন ‘প্রতিবন্ধী সংগঠনে’ পরিণত হয়েছে। নেতৃত্বের বিরোধ, স্থাবর সম্পতি দখলের প্রতিযোগিতা, সংস্থার নিজস্ব তহবিলের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ আর উপর্যুপরি মামলা পাল্টা মামলায় এখন স্থবির হয়ে গেছে সংস্থাটির কার্যক্রম। জানা গেছে, গত ১০ বছরে এসব হানাহানিতে সংস্থাটির সাবেক মহাসচিব সাবেক সচিবসহ খুন হয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। এসব কারণে দেশের বিপুল সংখ্যক দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিজস্ব স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিতে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না সংগঠনটি। অভিযোগ আছে গত ১০ বছরে নির্বাচিত তিনটি কমিটি এবং সংস্থাটির বর্তমান কমিটির একাধিক নেতার সহযোগিতায় বহিরাগত সন্ত্রাসী চক্র হাতিয়ে নিয়েছে সংস্থার অন্তত ৫০ কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধানে জানা যায়, সংস্থাটির নামে সাভার বাসস্ট্যান্ডে ৫ বিঘা জায়গাজুড়ে রয়েছে ২টি মার্কেট। বর্তমান বাজারে যার মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন সাভার পৌরসভা সেখানে দ্বিতল মার্কেট করার অনুমোদন দেয়। পর্যায়ক্রমে সেখানে প্রায় ৬ শতাধিক দোকান তৈরি হয়। যার সবই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। সাধারণ সদস্যরা জানান, বিক্রীত এসব দোকান থেকে অর্জিত বিশাল অংকের টাকার সঠিক কোনো হিসাব নেই। অন্ধ না হয়েও একটি স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্র এসব সম্পত্তির ভোগ দখল করছেন। সদস্যদের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমের নেপথ্যে আছেন সাভার পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আবদুর রহমান, সাবেক কাউন্সিলর আব্বাস আলী, সাভার থানা পুলিশসহ উপজেলার একাধিক সরকারঘেঁষা প্রভাবশালী নেতা। জাতীয় অন্ধ সংস্থার কাউন্সিল সদস্য ড. হারুন অর রশিদ অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান মহাসচিব আইয়ুব আলী হাওলাদার সংস্থাটিতে ডিক্টেটরশিপ চালু করেছেন। সাধারণ অন্ধ সদস্যরা সামর্থ্যের অভাবে যাতে বার্ষিক চাঁদা দিতে না পারেন। বারবার নির্বাচিত হওয়ার জন্য কাউন্সিল সদস্যদের মধ্যে মহাসচিবের অনুসারী ছাড়া আর কেউ যেনো থাকতে না পারে- সেটা নিশ্চিত করতেই এমন ব্যবস্থা। সাভারের মার্কেট থেকে আয়ের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করাই বর্তমান কমিটির একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, অন্ধদের মধ্যে প্রকৃত জন্মগত অন্ধ আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বা ডাকাতির ঘটনায় জনরোধে চোখ তুলে দিলে অবন্ধ হয়। জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিব আইয়ূব আলীর চোখ তুলে দেয়া হয়েছি। ছাত্র জনতার উপর হামলার ঘটনায় আইয়ূব আলীর নেতৃত্বে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। আর বকশীবাজারে অন্ধ অফিসে সন্ত্রাসী এম এম জাহিদ, মাইনুল ইসলাম নিখিলের নির্দেশে অস্ত্র নিয়ে নিউমার্কেট ও বক্সীবাজারে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে। তার, অন্যতম সহযোগি হচ্ছে, ঘিট্ট ুরুবেল, রহিম, আসিফ, হাসান, নজরুল হচ্ছে মাস্টারমাইন্ড। আর সাবেক মহাসচিব খলিলুর রহমানের দণ্ডিত হত্যাকারীরাও আইয়ূব আলীর সহচর হিসেবে অবস্থান করছে।
সূত্র জানায়, অন্ধদের কল্যাণে দেশ বিদেশে থাকা ধনী ব্যক্তি ও সংগঠন গোপনে মোটা অংকের টাকা অনুদান দেন। সেজন্য এরকম একটি জাতীয় সংস্থার আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব এবং বার্ষিক অডিটের জন্য একজন যোগ্য কোষাধ্যক্ষ রাখা জরুরি। কিন্তু বর্তমান মহাসচিব এই পদে একজন অযোগ্য ব্যবসায়ীকে নির্বাচিত করেছেন। যার কাছে সংস্থার প্রকৃত আয়-ব্যয়ের কোনো হিসেব নেই। এসব বিষয়ে জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিব আইয়ূব আলীর হাওয়াদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার কার্যালয়ে যাওয়ার পর কথা বলবেন বলে প্রতিবেদককে জানান। তিনি জানান, এসব মামলার ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা ভিত্তিহীন। একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ